মাইগ্রেন নিয়ে যার মাথা ব্যথা!


2017-01-20 15:10:18 893 0

ইজ মাইগ্রেন ইটসেল্ফ দ্যা রিজন অফ ইউর হেডেক! :( মাইগ্রেনই যাদের মাথাব্যথার কারণ তাদের জন্য এই পোস্ট। মাইগ্রেন যার আছে শুধুমাত্র সেই জানে যে এই রোগের ঝাঁজ কিরকম। এটি এমন একটি রোগ যার পরিপূর্ণ চিকিৎসা তাবদ দুনিয়াতে এখন পর্যন্ত নাই। এটি এমন একটি রোগ যা কখনও অন্যের কাছে প্রকাশ করা যায় না। জ্বর হলে যেমন মাথায় হাত দিলেই বুঝা যায় কিন্তু মাইগ্রেনের ব্যথা উঠলে যদি আপনি চিৎকার চেচামেচি না করেন তবে কারও সাধ্য নাই উপলব্ধি করার যে আপনার ভিতরে কি হচ্ছে। নিরবে জীবন ধ্বংস্য করে দিবে। মানুষের শরীরে যত রকমের ব্যথা আছে তার মধ্যে নাকি এই মাইগ্রেনের ব্যথা তৃতীয় স্থান অধিকার করে বসে আছে। প্রথম স্থানটি মেয়েদের দখলে! সন্তান প্রসবের সময় যে ব্যথা হয় সেই ব্যথা সবচেয়ে কষ্টকর। দ্বিতীয় হচ্ছে হার্টএ্যাটাক এবং তৃতীয় মাইগ্রেন।

মাইগ্রেন কি


The Public Posts মাইগ্রেন নিয়ে যার মাথা ব্যথা!


মাইগ্রেন এক বিশেষ ধরনের মাথা ব্যথা। মাইগ্রেন শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ হেমিক্রেনিয়া থেকে। হেমি অর্থ অর্ধেক আর ক্রেনিয়া অর্থ মাথার খুলি বা করোটি। এই ব্যাথা অর্ধ মাথায় হয় বলে এর নামকরণ করা হয় হেমিক্রেনিয়া। কিন্তু ব্যাথা একসাথে দুপাশেও হতে পারে অথবা এক পাশ থেকে আরেক পাশে দৌরাদৌরি করতে পারে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে শতকরা প্রায় ২০ ভাগ লোক কোন না কোন সময়ে এই ধরনের মাথাব্যথায় ভূগে থাকেন। যাদের মাইগ্রেন নেই তারা ধারনাও করতে পারবেন না কতটা কষ্টদায়ক এই রোগ।

মাইগ্রেনের কারণসমূহ

মাইগ্রেন হওয়ার হাজারো কারণ উল্লেখ করা যেতে পারে। তবে সচরাচর যেসব কারণের কথা শুনা যায় সেগুলো-

- বংশগত বা জেনেটিক

- দুশ্চিন্তা এবং অস্থিরতা

- শব্দ দূষণ, পরিবেশ দুষণ, বায়ু দুষণ ইত্যাদি

- মনোসোডিয়াম গস্নুটামেট

- মেয়েদের ক্ষেত্রে পিরিওডের সময়কাল এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়িও  মাইগ্রেনের কারণ হতে পারে

- একটানা বেশি সময় ধরে কম্পিউটারের মনিটর এবং টিভির দিকে তাকিয়ে থাকা

- ধূমপান ও মদ্যপান

- প্রচণ্ড রোদ অথবা গরম

- তীব্র গন্ধ যেমন আতর, পারফিউম ইত্যাদি।

- কম অথবা বেশি আলোতে কাজ করা (মাইগ্রেনের রোগীরা সাধারণত অন্ধকারে থাকতে বেশি পছন্দ করে)

- চকলেট বা এ জাতীয় খাবারের কারণে

- ঘুম কম হওয়া অথবা অতিরিক্ত সময় ধরে বিছানায় শুয়ে থাকা

- অনিয়মিত খাওয়া দাওয়া এবং কম পানি পান করার কারণেও মাইগ্রেন হতে পারে

তবে যে সিভিয়ার মাইগ্রেন রোগীর কারণে অকারণেও মাথা ব্যাথা উঠতে পারে। তারমানে উপরের উল্লেখিত কারণেও হতে পারে অথবা এমন সময় ব্যাথা হবে তখন আর কোন কারণই খুজে পাবে না। অজ্ঞাত কারণে ব্যাথায় কাতর হয়ে চিৎকার চেচামেচি করতে হবে। বিশেষজ্ঞরাও মাইগ্রেনের কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে প্রায় শ'খানেক কারণের কথা বলেছেন। এছাড়া ফুটনোটে লিখেছেন আরো অন্যান্য কারণেও এই ব্যাথা হতে পারে!

মাথাব্যথা মানেই কি মাইগ্রেন?

মাথাব্যথা মানেই যে মাইগ্রেন তা কিন্তু না। মাইগ্রেন রোগের কিছু ভিন্ন লক্ষণ আছে যা সাধারণ মাথাব্যাথা থেকে আলাদা। এ রোগের উৎস ও উপসর্গও আলাদা। অনেকেরই হয়ত হঠাৎ হঠাৎ মাথা ব্যাথা উঠে। এই মাথাব্যাথা নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলবে! এই ধরণের মাথাব্যাথা তীব্র না এবং খুব অল্প সময়েই সেরে যায়। তবে কেউ কেউ আছেন যাদের দীর্ঘদিন ধরে মাথাব্যাথা এবং উপরের কারণগুলো ছাড়াও সময়ে অসময়ে মাথাব্যাথা উঠে। তবে সাধারণ ব্যাথাও দীর্ঘদিন থাকতে পারে। শুধু তাই বলে ভাববেন না এটা মাইগ্রেন। সাধারণ মাথাব্যথা নিরাময় যোগ্য অন্যদিকে মাইগ্রেন স্থায়ীভাবে নিরাময়ের এখনও কোন উপায় বের হয়নি।

একটি বাস্তব উদাহরণ

যেমন আমি নিজে প্রায় ১৮ বছর ধরে এই মাইগ্রেন নামক রোগের চাষবাস করে আসছি। কত ডাক্তার, কত মেডিক্যাল টেস্ট করিয়েছি তার কোন হিসাব নাই। সিটিস্কান করেও মাথাই কোন সমস্যা খুজে পায়নি ডাক্তাররা। মাইগ্রেনের কিছু কমন ট্যাবলেট আছে। যে ডাক্তারের কাছেই যাবেন ঐ একই ট্যাবলেট (কোম্পানী আলাদা হতে পারে) প্রেসক্রাইব করবে। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পরও খুব বেশি লাভ হয়নি। এখনও ট্যাবলেট সাথে রাখতে হয় সবসময়। ব্যাথা উঠার সাথে সাথে ট্যাবলেট খেয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকি। আর দীর্ঘদিন এই ব্যাথার সাথে থাকতে থাকতে কিছু কৌশল রপ্ত করেছি যা ব্যাথা নিয়ন্ত্রণ করতে বা কমাতে সাহায্য করে। এ্যালোপাতির চিকিৎসা যখন ব্যার্থ হলো তখন কবিরাজী চিকিৎসা ভেষজ ভেষজ চিকিৎসা ইত্যাদি কোন কিছুই বাদ দেয়নি।

পরিবার, আপনজন, বন্ধু বান্ধব প্রায় সবাই আমার এই ব্যাথা সম্পর্কে ওয়াকিবহল। কারণ যখন ব্যাথা উঠতো তখন প্রচণ্ড চিৎকার চেচামেচি করতাম এবং মাথায় পানি দিতে হতো অনেকক্ষণ। আমার মা বেচে থাকতে মাথায় পানি দেয়া ও বিভিন্ন কায়দায় মাথা ম্যাসেজ করার কাজগুলো করত। এরপর দায়িত্ব পরে আমার বউয়ের ঘারে। সেও অনেক করেছে আমার জন্য। সাত আট মাস আগে বোনের বাসায় গিয়ে একবার মাইগ্রেনের তীব্র ব্যাথা শুরু হলো। আর রক্ষা নাই। চিল্লাচিল্লি করার কারণে আসে পাশের সবাই হাজির। বোন দুলাভাই মাথায় পানি ঢালছে। প্রায় আধা ঘন্টা মাথায় পানি দেবার পর ব্যাথার তীব্রতা কিছুটা কমে। বর্তমানে আল্লাহর অশেষ রহমতে ব্যাথার সেই তীব্রতা আর নেই। আগে সারভিনাপ্রক্স ৫০০এমজি (সানডোজ কোম্পানির) খেতে হতো সপ্তাহে দু-তিন বার এখন শুধু নাপা খেলেই কাজ হয়। এজন্য আল্লাহর কাছে অনেক সুকরিয়া।

এই মাইগ্রেনের জন্য আমাকে জীবনের প্রথম ফুলটাইম চাকুরি ছাড়তে হয়েছিল। এই মাইগ্রেনের কারণেই একটানা দীর্ঘক্ষণ পড়তে পারতাম না। যখন সব আধুনিক চিকিৎসা ব্যার্থ হলো তখন শেরপুর গিয়েছিলাম। এক কবিরাজের কাছে। ঢাকা থেকে শেরপুর বাস থেকে নেমে আবার টেম্বোতে প্রায় ২০ কিলো. এরপর বৃষ্টির মধ্যে পায়ে হেটে কিছুদূর গিয়ে জানলাম বড় একটা বিলের অপর প্রান্তে ঐ কবিরাজ বসেন। বিলের হাটুজল পানি পার হয়ে গেলাম। গন্তব্যে পৌছে জানলাম সেই কবিরাজের রোগী দেখার সময় শেষ। আজ আর কোনভাবেই নতুন রোগী সে দেখবে না। হাসবেন না দয়া করে। :) আমি কখনও এসব কবিরাজি তাবিজ টাবিজে বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু যখন সকল বিজ্ঞান ব্যার্থ হয়ে যায় তখন মনে হয় এসব ভৌতিকতাকেই মানুষ সান্তনা মনে করে। আবার অলৌকিকতা বলে যে কিছুই নেই তাও কিন্তু না।

মাইগ্রেনের লক্ষণসমূহ যা হতে পারে

- মাথার একপাশ বা উভয় পাশে তীব্রভাবে ব্যথা হয়

- কোন ব্যাথা তিন চার ঘন্টা স্থায়ী হয় এবং এই সময়ের মধ্যেই ঝড় তুলে শেষ হয়ে যায়

- আবার কোন কোন ব্যাথা সপ্তাহ ধরে থাকে

- বমিবমিভাব বা ব্যাথা বেশি তীব্র হলে বমি পারে

- দৃষ্টি শক্তির গোলযোগ হতে পারে

- কথা ভালোভাবে বলতে না পারা

- কোন কাজে মনোযোগ দিতে না পারা

- চোখের সামনে রঙিন আলোকচ্ছটা দেখা দিতে পারে

- শারীরিক দুর্বলতা, ক্লান্তি দেখা দেয়া

- চোখে ঝাপসা দেখা

- মাথা ঘোরানো

মাইগ্রেনের প্রকারভেদ

মাইগ্রেন কে কয়েকভাবে ভাগ করা যায়। যেমনঃ ক্লাসিক্যাল, কমন, অপথেলমোপ্লেজিক, ব্যাসিলার আর্টারি, হেমিপ্লেজিক এবং ফেসিওপ্লেজিক। আরো কয়েক ধরণের মাইগ্রেন গবেষণায় পাওয়া গেছে। তবে এগুলোর মধ্যে ক্লাসিক্যাল এবং কমন এই দুই ধরণের মাইগ্রেন সাধারণত বেশি দেখা যায়।

ক্লাসিক্যাল মাইগ্রেন

- দৃষ্টিবিভ্রম হতে পারে এবং হাত, পা, মুখের চারপাশে ঝিনঝিনে অনুভূতিসহ শরীরের এক পাশে দুর্বলতা ও অবশভাব হতে পারে।

- এ ধরণের মাথাব্যাথা মাথার এক পাশ থেকে শুরু হয় আস্তে আস্তে পুরো স্থানেই বিস্তৃত হয়।

- প্রচুর ঘাম বের হতে পারে। বমি কিংবা বমি বমি ভাব দেখা দিতে পারে।

কমন মাইগ্রেন

এ জাতীয় মাইগ্রেনই বেশি হয়ে থাকে। কমন মাইগ্রেনের ব্যাথা প্রায় ৪-৭২ ঘণ্টা ব্যাপী হতে পারে এবং নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে-

- মাথার একপাশে অথবা দুপাশেই ব্যাথা

- ব্যাথা পর্যায়ক্রমে একপাশ থেকে আরেকপাশ যেতে পারে

- এই ব্যাথা মাথার চারপাশ থেকে শুরু করে নাগের দিকে বা ঘারেও ছড়িয়ে পরতে পারে

- বমি বমি ভাব অথবা বমি হওয়া

- তীব্র আলো, শব্দ অথবা উগ্র কোন গন্ধ পেলে ব্যাথা আরো বেড়ে যেতে পারে।

করণীয়

- যাদের এ রোগ আছে, তাদের অন্তত দৈনিক ৮ ঘণ্টা ঘুম আবশ্যক।

- কফি, চকোলেট,পনির, কোমল পানীয়, মদ এড়িয়ে চলতে হবে।

- দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা যাবে না।

- জন্মবিরতিকরণ পিল না ব্যবহার করে অন্য পদ্ধতি গ্রহণ করা যেতে পারে।

- রিশ্রম, মানসিক চাপ, দীর্ঘ ভ্রমণ এড়িয়ে চলতে হবে।

- অতিরিক্ত বা কম আলোতে কাজ না করা।

- কড়া রোদ বা তীব্র ঠাণ্ডা পরিহার করতে হবে।

- উচ্চশব্দ ও কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে বেশিক্ষণ না থাকা।

- বেশি সময় ধরে কম্পিউটারের মনিটর ও টিভির সামনে না থাকা।

ঘড়ে বসেই মাইগ্রেন ব্যথা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব

- যে স্থানে ব্যথা বেশি অনুভূত হচ্ছে, সেখানে বরফ বা ঠাণ্ডা সেক দিন।

- মাথার নিচে ও কাঁধে বালিশ রেখে হেলান দিয়ে থাকুন।

- যেখানে ব্যাথা খুব তীব্র সেখানেও বালিশ দিয়ে জোরে চাপ দিয়ে থাকতে পারেন।

- পারফিউম বা কোনো তীব্র গন্ধ শুঁকবেন না।

- কোনো কাজের চাপ নেবেন না।

- রোগের বৈশিষ্ট মতই অন্ধকার ঘরকে বেশি পছন্দ করবেন। সেটাই করা উচিত।

- পরিমিত চা খেতে পারেন তবে কফি না খাওয়াই ভালো।

- বই পড়বেন না বা টিভি দেখবেন না।

- কম্পিউটার মনিটরের আলো থেকে দূরে থাকুন।

- কোনভাবেই যেন কোনরকম শব্দ না আসে ঘরে।

আগেই বলেছি যে মাইগ্রেন সম্পূর্ণরূপে ভালো করার জন্য কোন চিকিৎসা পদ্ধতি এখন পর্যন্ত বের হয়নি। অবশ্যয় চিকিৎসকের সরোণাপন্ন হতে হবে। তারা আপনাকে একটা ঘুমের ট্যাবলেট দিবে, সাথে কিছু ব্যাথানাশক ট্যাবলেট এবং তীব্র ব্যাথা উঠলে তার জন্য একটা ট্যাবলেট। ব্যাস। যেহেতু ক্রনিক ডিজিস সেহেতু মাসের পর মাস বছরের পর বছর ধরে খেতে থাকুন। ভাগ্যবান হলে হয়ত সেরেও যেতে পারে। তবে বয়সের সাথে এই রোগের একটা যোগসূত্র আছে। কোনরকম চিকিৎসা ছাড়াই বয়স বারার পর এই রোগ আপনাআপনিই ভালো হয়ে য়াওয়ার উদাহরণ পাওয়া গেছে।

প্রসঙ্গ :
মাইগ্রেন মাথা ব্যথা

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Name*

Web

Email*